যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের একটি বড় অংশ নিহত হয়েছেন। যুদ্ধের প্রথমদিন গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নিহত হন ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। এ ছাড়া নিরাপত্তা উপদেষ্টা আলী লারিজানি, বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর, নৌবাহিনী প্রধান আলিরেজা তাংসিরি’র মতো অনেক জেষ্ঠ্য রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা নিহত হন।
যুদ্ধে নিহত ইরানের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো—
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি
১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আলী খামেনি ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম ঘণ্টাতেই বিমান হামলায় নিহত হন। হামলার সময় তিনি তেহরানে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ছিলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই হামলায় তার পুত্রবধূ, কন্যা এবং অন্তত একজন নাতি বা নাতনিও নিহত হন।
খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি আহত অবস্থায় বেঁচে যান এবং পরে সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে তিনি এখনো জনসম্মুখে আসেননি।
ইরনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, আলী খামেনির দাফন আগামী ৯ জুলাই তার জন্মস্থান মাশহাদে অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে তেহরান ও কোম শহরে কয়েকদিনব্যাপী জানাজা ও শোকানুষ্ঠান হবে।
নিরাপত্তা উপদেষ্টা আলী লারিজানি
ধর্মীয় নেতা না হয়েও আলী লারিজানি দীর্ঘদিন ধরে ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন। গত ১৭ মার্চ ইসরাইলি হামলায় তিনি নিহত হন। ওই হামলায় তার পরিবারের কয়েকজন সদস্যও প্রাণ হারান।
মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগে তিনি তেহরানে সরকারপন্থি এক সমাবেশে প্রকাশ্যে অংশ নিয়েছিলেন।
বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর
মোহাম্মদ পাকপুর আগে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের স্থলবাহিনীর প্রধান ছিলেন। ২০২৫ সালের জুনে পূর্বসূরি হোসেইন সালামি নিহত হওয়ার পর তিনি গার্ড বাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব নেন।
যুদ্ধের প্রথম দিনেই তিনি নিহত হন। পরে তার স্থলাভিষিক্ত হন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী আহমদ বাহিদি।
গার্ড বাহিনীর নৌবাহিনী প্রধান আলিরেজা তাংসিরি
১৯৮০-৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধে অংশ নেওয়া তাংসিরি ২০১৮ সাল থেকে গার্ড বাহিনীর নৌবাহিনীর প্রধান ছিলেন। তিনি ইরানের সামরিক অঙ্গনের অন্যতম পরিচিত মুখ ছিলেন।
ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী তাকে হরমুজ প্রণালিতে মাইন পেতে নৌ চলাচল বন্ধ করার পরিকল্পনার মূল ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
উপদেষ্টা আলী শামখানি
আলী শামখানি ১৯৮০-এর দশক থেকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। যুদ্ধের প্রথম দিন এক বিমান হামলায় তিনি নিহত হন।
তেহরানের তাজরিশ স্কয়ারে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়।
এর আগে ইসরাইলের জুন মাসের হামলায় তাকে মৃত বলে খবর প্রকাশিত হয়েছিল, কিন্তু পরে তিনি জীবিত অবস্থায় সামনে আসেন।
গোয়েন্দামন্ত্রী ইসমাইল খতিব
ইসমাইল খতিব ছিলেন একজন ধর্মীয় নেতা এবং ২০২১ সাল থেকে ইরানের গোয়েন্দামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন। গত ১৮ মার্চ তেহরানে এক ইসরাইলি হামলায় তিনি নিহত হন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো তাকে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার অভিযোগে সমালোচনা করত।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ
ইরান-ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞ এই সামরিক কর্মকর্তা ২০২৪ সাল থেকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। যুদ্ধের প্রথম দিনেই বিমান হামলায় তিনি নিহত হন।
বাসিজ বাহিনীর প্রধান গোলামরেজা সোলেইমানি
বাসিজ হলো বিপ্লবী গার্ডের অধীন একটি স্বেচ্ছাসেবী আধাসামরিক বাহিনী। গোলামরেজা সোলেইমানি এর প্রধান ছিলেন এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, বিক্ষোভ দমনে এই বাহিনীর ভূমিকা ছিল ব্যাপক।
গত ১৭ মার্চ এক বিমান হামলায় তিনি নিহত হন।
বিপ্লবী গার্ডের মুখপাত্র আলী মোহাম্মদ নায়িনি
মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় তিনি নিহত হন।
তার মৃত্যুর ঠিক আগে ফার্স নিউজ এজেন্সি তার একটি বক্তব্য প্রকাশ করে, যেখানে তিনি বলেন, যুদ্ধ চললেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন অব্যাহত রয়েছে এবং এ খাত ‘পূর্ণ নম্বর পাওয়ার যোগ্য’।
সামরিক দপ্তরের প্রধান মোহাম্মদ শিরাজি
যুদ্ধের প্রথম দিনেই নিহত হন মোহাম্মদ শিরাজি। সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ে কর্মরত এই কর্মকর্তা ইরানের বিভিন্ন নিরাপত্তা ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন।
সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আবদুররহিম মুসাভি
আবদুররহিম মুসাভি যুদ্ধের প্রথম দিনেই নিহত হন। ২০২৫ সালের জুনে পূর্বসূরি মোহাম্মদ বাঘেরি নিহত হওয়ার পর তিনি এই দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন।
তার দায়িত্ব ছিল বিপ্লবী গার্ড ও নিয়মিত সেনাবাহিনীর মধ্যে সমন্বয় সাধন করা।


